ইউরোপে ঠাণ্ডা আবহাওয়ার কারণে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে। এতে অঞ্চলটির প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ২০১৮ সালের পর থেকে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে কমে যাচ্ছে। গ্যাস ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইউরোপের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে মজুদাগারগুলো ৭০ শতাংশ পূর্ণ আছে, যা এক বছর আগের একই সময়ে ছিল প্রায় ৮৬ শতাংশ। গত বছরের সর্বোচ্চ মজুদের তুলনায় বর্তমানে গ্যাসের পরিমাণ ২৫ শতাংশ কমে গেছে, যা গত সাত বছরের মধ্যে মজুদ সর্বোচ্চ কমে যাওয়ার ঘটনা। খবর অয়েলপ্রাইস ডটকম।
গোল্ডম্যান স্যাকস গ্রুপ ইনকরপোরেটেডের প্রাকৃতিক গ্যাস গবেষণা বিভাগের প্রধান সামান্থা ডার্ট বলেন, ‘মার্চের শেষ নাগাদ মজুদ যত কমে যাবে, পরবর্তী শীতকালের আগে তা পূর্ণ করা তত কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, তাপমাত্রা গড়ের তুলনায় বেশি কমে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ আরো বেড়ে যাবে।’
তবে গ্যাসের চাহিদা বাড়লেও সরবরাহে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ঘাটতি তৈরি হয়নি। এতে জ্বালানিটির দাম কিছুটা কমেছে। গত সোমবার ইউরোপের ফিউচার মার্কেটে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম কমে প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় ৪৭ দশমিক ৯০ ইউরোয় নামে। এর আগের সপ্তাহে দাম ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল।
রাশিয়া থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে আমদানীকৃত গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ইউরোপ বিশ্বের অন্যান্য দেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছে। এতে বাজারে অস্থিরতার ঝুঁকি বেড়েছে। পাশাপাশি যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে নরওয়ের হ্যামারফেস্ট এলএনজি প্লান্ট বন্ধ হওয়ায় বাজারে অস্থিরতা আরো তীব্র হতে পারে।
এদিকে নতুন বছরের প্রথম দিনে ইউক্রেনের মধ্য দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ইউরোপের জ্বালানি বাজারে মস্কোর আধিপত্যের সমাপ্তি ঘটল বলে মনে করা হচ্ছে। রাশিয়ার গ্যাস কোম্পানি গ্যাজপ্রম জানিয়েছে, ইউক্রেন নতুন ট্রানজিট চুক্তি নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানালে তারা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
ট্রানজিট চুক্তি নবায়ন না হওয়ায় ইউক্রেন বছরে ১০০ কোটি ডলার পর্যন্ত ট্রানজিট ফি হারাবে। এ ঘাটতি পূরণে তারা অভ্যন্তরীণ গ্যাস ট্রান্সমিশন শুল্ক চার গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। অন্যদিকে গ্যাজপ্রম প্রায় ৫০০ কোটি ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হবে, যা গ্যাস বিক্রি থেকে আয় হতে পারত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মোট গ্যাস আমদানির ৫ শতাংশ ইউক্রেনের ভূখণ্ড হয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ হতো।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ হওয়ার প্রাক্কালে রাশিয়া থেকে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। সে সময় এ নিয়ে ভুগতে হয়েছিল পশ্চিমা দেশগুলোকে। তবে এবার বিকল্প উৎস খুঁজে পেতে সফল হয়েছে তারা। ফলে আগের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা পূর্বে সতর্ক করেছিলেন, রাশিয়া থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বন্ধের কারণে অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে স্লোভাকিয়া এরই মধ্যে বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। আজারবাইজানের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি এসওসিএআর স্লোভাকিয়ার বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় জ্বালানি অপারেটর এসপিপিকে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে।
এদিকে বিশ্লেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপে উদ্ভূত পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়াকে হটিয়ে ইউরোপের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও নরওয়ে। গত বছর নরওয়ে ৮ হাজার ৭৮০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ করেছে ইউরোপে, যা অঞ্চলটির মোট আমদানির ৩০ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহ করেছে ৫ হাজার ৬২০ কোটি ঘনমিটার, যা মোট আমদানির ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
ইউরোপের বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারীও যুক্তরাষ্ট্র। গত বছর দেশটি ইউরোপের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় অর্ধেক সরবরাহ করেছে, যা পরপর তিন বছরের জন্য ইউরোপে অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি রফতানির রেকর্ড।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের মোট এলএনজি আমদানির ২৭ শতাংশ (দৈনিক ২৪০ কোটি ঘনফুট), ২০২২ সালে ৪৪ শতাংশ (দৈনিক ৬৫০ কোটি ঘনফুট) ও ২০২৩ সালে ৪৮ শতাংশ (৭১০ কোটি ঘনফুট) সরবরাহ করেছে।